বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্যের বিস্তার:

Overview
6 Min Read

ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা তথ্য ও ভারত থেকে আসা অপতথ্য প্রভাবিত করছে ভোটারদের মনোভাব নির্বাচন কমিশন এবং fact‑check সংস্থাগুলো সতর্কতার পথে

সানডে টাইমস: অনলাইন ডেস্ক | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ঢাকা

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্যের বিস্তৃত ‘বন্যা’ লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মিথ্যা খবর, বিভ্রান্তিকর পোস্ট এবং বানোয়াট তথ্য কেবল সীমিত সামাজিক মিডিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; তা ভার্চুয়াল পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটারদের মনোভাব প্রভাবিত করার জন্য এটি একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। শুধু দেশের মধ্যে নয়, অপতথ্যের অনেক অংশ আসছে প্রতিবেশী ভারত থেকে, যা নির্বাচনের পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে।

বাংলাদেশি fact‑checking সংস্থা রিউমার স্ক্যানার জানায়, ২০২৫ সালে অন্তত ১৫৫টি বিভ্রান্তিকর পোস্ট বা নিউজ ছড়িয়েছে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইন আউটলেটের মাধ্যমে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতীয় সোর্স থেকে এসেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে, যা ভোটারদের ভুল ধারণা এবং বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

এই অপতথ্যের ধরন ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। কখনও মোবাইল ফোন বা ভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে ভুল তথ্য ভাইরাল হচ্ছে, কখনও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ভাইরাল পোস্টে বারিশালে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল জব্দ হওয়া ঘটনা অন্য দলের নেতার সঙ্গে ভুলভাবে যুক্ত করা হয়েছিল। পরে fact‑check সংস্থা তা ভুয়া হিসেবে ঘোষণা করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মিথ্যা তথ্যের প্রবাহ ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করার জন্য পরিকল্পিত। এটি ভোটারদের মধ্যে ভয়, সন্দেহ এবং বিভ্রান্তি তৈরি করছে। অনেক ভোটার ভুল তথ্যের কারণে ভোট দিতে দ্বিধা বোধ করছে। অন্যদিকে কিছু মানুষ সামাজিক মিডিয়ায় অপতথ্য ছড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন বাড়াচ্ছে। এর ফলে সমাজে আস্থা এবং সংহতি কমে যাচ্ছে।

AI এবং প্রযুক্তি ব্যবহারও এই সমস্যাকে জটিল করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি ছবি, ভিডিও এবং অডিও এখন খুব সহজেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো যায়। এগুলো স্থানীয় ভাষা এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে গেলে সাধারণ ভোটার সহজেই বিভ্রান্ত হয়। ভুয়া ভিডিও বা deepfake কনটেন্টগুলো এখন ভোটারদের জন্য বাস্তব পরিস্থিতি হিসেবে প্রদর্শিত হয়, যা সত্য ও মিথ্যার সীমানা অস্পষ্ট করে দেয়

সরকারি ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, ভোট প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য হবে। তবে কিছু কণ্ঠস্বর ভোট স্থগিত হবে বা নির্দিষ্ট এলাকায় ভোট প্রতিহত হবে—এই ধরনের ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করছে। কমিশন ইতিমধ্যেই এসব অপতথ্যের বিরুদ্ধে সতর্ক বার্তা দিয়েছে।

নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অপতথ্য এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের এই বন্যা শুধুমাত্র ভোটারদের বিভ্রান্ত করে না; এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আস্থা, সমাজের সংহতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করে। তাই শুধু fact‑check বা আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। জনগণকে সচেতন করা, সঠিক তথ্য দ্রুত সরবরাহ করা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার প্রশিক্ষণ দেওয়া অপরিহার্য।

সাম্প্রতিক কেস স্টাডি দেখায়, একটি ভুয়া নিউজের কারণে একটি ছোট উপজেলা পর্যায়ে ভোটাররা বিভ্রান্ত হয়ে ভোট কেন্দ্রে আসতে দেরি করেছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা যখন সত্যিকারের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন, তখন অনেক ভোটার বেছে নিয়েছেন তাদের ভয় ও ভুল ধারণার ভিত্তিতে ভোট প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সময়। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্য সরাসরি ভোটারদের আচরণে প্রভাব ফেলে

এই ধরনের অপতথ্য বিরূপ প্রভাব শুধু ভোট প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি পরিবার, সমাজ ও সম্প্রদায় স্তরে বিভাজন সৃষ্টি করে। ভুল তথ্যের কারণে মানুষ একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করছে, রাজনৈতিক মতবিরোধ আরও তীব্র হচ্ছে। ভোটাররা অনেক সময় বিশ্বাসযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য না পেয়ে মিথ্যা নিউজের ওপর নির্ভর করছে, যা সামাজিক আস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আঘাত নিয়ে আসে।

তথ্য প্রযুক্তির প্রসার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারের কারণে এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু fact‑check করা বা অপতথ্য ব্লক করা যথেষ্ট নয়; জনগণকে ডিজিটাল সাক্ষরতার প্রশিক্ষণ দেওয়া, সঠিক তথ্য দ্রুত পৌঁছানো এবং সাংবাদিকতা শক্তিশালী করা অপরিহার্য।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই অপতথ্যের বিস্তার একটি দেশীয় সমস্যা নয়। এটি প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল যুগে নির্বাচন শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; প্রতিবেশী দেশ থেকেও তথ্য প্রবাহ আসছে, যা নির্বাচন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলছে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা গেলে, অপতথ্য ভোটারদের মনোবল ও আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করছে। তারা ভুল তথ্যের কারণে ভোট দিতে দ্বিধা বোধ করছে। এছাড়া, পরিবার এবং সামাজিক স্তরে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হচ্ছে। এটি সমাজে অবিশ্বাস ও বিভাজন তৈরি করছে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ।

সরকার এবং এনজিওগুলো বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করছে। সামাজিক মিডিয়ায় অপতথ্য শনাক্ত করা, fact‑check করা এবং সঠিক তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি পর্যাপ্ত নয়; ভোটারকে সচেতন করা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার প্রশিক্ষণ প্রদান করা আরও জরুরি, যাতে ভোট প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য থাকে।

সংক্ষেপে, নির্বাচনের আগে সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্যের বিস্তার একটি জটিল সমস্যা। এটি মোকাবিলায় প্রয়োজন:

সঠিক তথ্য দ্রুত পৌঁছানো

জনগণকে ডিজিটাল সাক্ষরতার প্রশিক্ষণ দেওয়া

fact‑check সংস্থাগুলোর কার্যক্রম বাড়ানো

সামাজিক মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও বন্ধ করা

    এই পদক্ষেপগুলো নিলে ভোট প্রক্রিয়া স্বচ্ছ থাকবে, ভোটারের আস্থা ফিরবে এবং সমাজে বিভাজন কমে যাবে।

    নির্বাচনের দিন আসার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রচারণার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ভোটাররা কতটা বিভ্রান্ত হয়েছে, কতটা সচেতনভাবে অংশ নিয়েছে, তা নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। সমাজ এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে, সঠিক তথ্য, সচেতন ভোটার এবং সক্রিয় মিডিয়া একসাথে কাজ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

    Share This Article
    Leave a comment

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *