মুঠোফোন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন ভোটার, প্রার্থী ও সাংবাদিক: ইসি সচিব

Overview
5 Min Read

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইসি ভুল-বোঝাবুঝি দূর করে মোবাইল ফোন নীতি সংশোধন করেছে গোপন কক্ষে ছবি তোলা নিষিদ্ধ থাকবে

সানডে টাইমস: অনলাইন ডেস্ক | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ঢাকা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে মাত্র দু’দিন পিছিয়ে রেখেই দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) সোমবার এক নতুন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে, যার ফলে ভোটার, প্রার্থী, নির্বাচনী এজেন্ট, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকরা ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন, তবে ভোটের গোপন কক্ষে মোবাইল দিয়ে ছবি তোলা বা ভিডিও করা নিষিদ্ধ থাকবে। এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনী দিনের তথ্য পরিবেশনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হলেও এর পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিদ্যমান।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে গত রোববার ইসি একটি নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে ভোটারদের মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধের কথা জানিয়েছিল। ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছিল ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণ ভোটার, সাংবাদিক বা নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্তটি দ্রুত সমালোচনার মুখে পড়ে এবং রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক সংগঠন ও নাগরিক অধিকার গোষ্ঠীর কাছ থেকে কঠোর প্রতিক্রিয়া উভয়ই পাওয়া যায়।

ইসি-এর জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, “আগের নির্দেশনায় যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল তা যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি এবং এতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। আমরা সংশোধিত পরিপত্র জারি করছি যাতে কোনো সন্দেহের স্থান না থাকে।” সংশোধিত নির্দেশনায় ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন বহন ও ব্যবহার বিষয়ে পুরোনো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তা প্রাধান্যহীন ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু ভোট প্রদানের গোপন কক্ষে মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখা হয়েছে।

এই পরিবর্তনটি আসছে এমন এক সময়ে, যখন স্মার্টফোনকে আধুনিক সাংবাদিকতার “প্রধান হাতিয়ার” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে লাইভ ছবি, ভিডিও, টেক্সট আপডেট ও ঘটনা-প্রবাহ সরাসরি পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারেন — যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু রোববার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞায় এই মৌলিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেত, যা সাংবাদিক সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) এবং রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (RFED) কর্তৃক তীব্র সমালোচিত হয়। তারা মন্তব্য করে যে মোবাইল ফোনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ ও গণতান্ত্রিক তথ্য প্রবাহকে বিপন্ন করতে পারে, এবং এর ফলে সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহারিক অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের এই পরিবর্তিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল বহন করতে পারবেন:

  • সাধারণ ভোটার
  • নির্বাচনী প্রার্থী ও তাদের এজেন্ট
  • সাংবাদিক ও অননুমোদিত পর্যবেক্ষক
    এদের জন্য কেন্দ্রের প্রবেশের সময় মোবাইল ফোন নিয়ে আসার বিষয়টি আর বাধা হিসেবে গণ্য হবে না। কিন্তু লুৰ্কিং গোপন কক্ষে — যেখানে ভোট প্রদান করা হয় — কেউ মোবাইল ব্যবহার বা ছবি তুলতে পারবেন না। এই নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য হলো ভোটের গোপনীয়তা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা।

সম্প্রতি ইসির এই পদক্ষেপের পেছনে যে সরাসরি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট কাজ করেছে, তা হচ্ছে: নির্বাচনী দিনটিকে স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিকভাবে পরিচালনা করার চাপ ও প্রচারণা। সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরাও মোবাইল ডিভাইসকে ভোট-পরিবেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের সরঞ্জাম বলে মনে করেন। তাই মোবাইল নিয়ন্ত্রণের ওপর খুব কঠোর বিধি আরোপ করলে তা তথ্য নিয়ন্ত্রণের উদ্বেগ তৈরি করবে, সেই উদ্বেগ শোনা যায় বিভিন্ন মহলের বক্তৃতা ও লেখায়।

এই পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ ভোটার হিসেবে ভাবলে বোঝা যায়, মোবাইল ফোন আজকের বাংলাদেশে শুধু একটি যোগাযোগের যন্ত্র নয় — এটি তার ভোটাধিকার প্রয়োগের সময় নিজস্ব অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ করার একটি মাধ্যমও বটে। ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের উপর নির্ভরকারী বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুর জীবন্ত ছবি — কখনাে দীর্ঘ লাইনের ছবি, কখনাে ভোটারদের প্রতিক্রিয়া, কখনাে কোনও অনিয়ম বা বিষয়ধর্মী পর্যবেক্ষণ — সবই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দ্রুত ও সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছতে পারে।

তবে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল সম্পর্কিত বিতর্কগুলো শুধুই সাংবাদিক বা ভোটারের ‘সুবিধা’ সম্পর্কিত নয়; এগুলো গণতান্ত্রিক নিয়মনীতি, তথ্যের স্বচ্ছতা ও জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কেও মূল প্রশ্ন তোলে। এখনো নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে সমন্বয় বা সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসাটা কিছু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের কাছে নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং স্বচ্ছতার ওপর প্রশ্ন তোলে

বিশ্লেষকদের মতে, ইসির এই সংশোধিত সিদ্ধান্তে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার সময় তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা পুনরায় নিশ্চিত করার দিকে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত প্রদান করেছে। একই সাথে গোপন কক্ষে মোবাইল নিষেধ করে রাখা হয়েছে যাতে ভোটের গোপনীয়তা, নিরপেক্ষতা এবং মৌলিক ভোটাধিকার সুরক্ষিত থাকে এটি ডিজিটাল সময়ের ভোট-পদ্ধতিকে মানিয়ে নেওয়ার একটি পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ ভোট-পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি উচ্চারিত হয়েছে। ইসির এই সংশোধিত মোবাইল-নীতিও সেই দাবির উত্তরের একটি ধাপ যদিও এর বাস্তবায়ন ও ক্ষেত্র-পর্যায়ে তার প্রভাব কেমন হবে, তা ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সময় এবং পরে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে তা স্পষ্ট করবে।

Share This Article
Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *